ভাবছিলাম যে, আমাদের সমস্যাটা আসলে কোন জায়গায়? কেন বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে না? প্রথমত এর জন্য আমরা আমাদের বিশাল জনসংখ্যার দোষ দেই, দ্বিতীয়ত শিক্ষার অভাব, তৃতীয়ত…এভাবে আমরা নানা কিছুর দোষ দিয়ে হাজারটা অজুহাত দাঁড় করিয়ে ফেলি। কিন্তু গভীরভাবে ভাবতে গেলে, বা একটু অন্যভাবে ভাবতে গেলে আমরা অন্য একটা সমীকরণের চিত্র দেখতে পাই। সেই সমীকরণটা আপনাদের কাছে খুলে বলি।

গলতটা আমাদের গোড়ায়, মানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। দেখুন, মেনে নিলাম আমাদের দেশে স্বাক্ষরতার হার কম, সমাজের ৩০ শতাংশ মানুষ এখনও অশিক্ষিত; কিন্তু তাই বলে কি আমাদের দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কম? আমাদের দেশের যে আয়তন, আমাদের যে পরিমাণ কর্মসংস্থান এবং যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, হিসাব করলে দেখা যাবে সে অনুপাতে শিক্ষিত মানুষের হার অনেক বেশি। আমরা যদি জনসংখ্যার অনুপাতে শিক্ষিত মানুষের শতকরা হার হিসাব না করে, কত সংখ্যক শিক্ষিত মানুষ আমাদের দেশে রয়েছে—সেটা যদি হিসাব করি তাহলে এর সঠিক চিত্র আমাদের সামনে চলে আসবে। সে হিসেবে আমাদের দেশে শিক্ষিত জনসংখ্যা বিপুল।তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো আমাদের শিক্ষায়। আমাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা বা অপ্রাতিষ্ঠানিক যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষা কারিকুলাম উপনিবেশী সময়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ কীভাবে পড়ানো হবে, কী কী পড়ানো হবে, কোন সময় পড়ানো হবে, পাঠ্যপুস্তকের মূল ভাবনা কেমন হবে, শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী হবে—এমন যাবতীয় সকল কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে, যাকে আমরা উপনিবেশ সময় বলে থাকি। তো, সেই সময়ে এ দেশে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল লেখাপড়া শিখে কিছু লোক ইংরেজদের বশংবদ হিসেবে তৈরি হবে, তাদের অধীনে চাকরি-নোকরি করবে—এই। এর বাইরে মহৎ কোনো উদ্দেশ্য এ শিক্ষাব্যবস্থায় রাখা হয়নি। এই শিক্ষা কারিকুলাম সম্পূর্ণভাবে চাকরি ও জীবিকার উদ্দেশে প্রণীত হয়েছিল।

ইংরেজদের থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে ৭০ বছর হয়ে গেল, বাংলাদেশের স্বাধীনতারও ৫০ বছর পূর্তি হবে বছর দুয়েক পর। কিন্তু আমরা কি সেই উপনিবেশী শিক্ষাধারা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছি? শিক্ষা মানেই আমাদের কাছে এখনও চাকরিরই অন্য নাম। কারণ দীর্ঘ দুইশ বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশ আমাদের এটাই শিক্ষা দিয়ে গেছে। কিন্তু শিক্ষার অপর নাম হওয়ার কথা ছিল সৃজনশীলতা, জ্ঞানের বিস্তার, বিজ্ঞানের উন্নয়ন।দুঃখজনকভাবেই সেটা হয়নি। আমরা সেই কারিকুলাম থেকে বের হতে পারিনি। ফলে আমরা যতই শিক্ষিত হই বা আমাদের স্বাক্ষরতার হার যতই বাড়ুক, আমাদের মানসিকতা এখনও বশংবদ হওয়ার শিক্ষা নিয়েই বড় হচ্ছে। চাকর হওয়ার নানা ধরনের কথামালা দিয়ে সাজানো আমাদের সিলেবাস আর পাঠ্যপুস্তক। এই শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই আমাদের উন্নয়ন সবক শেখাতে পারবে না।

আমাদের নবীজির ইতিহাস দেখুন। তিনি কিন্তু নিরক্ষর ছিলেন, তাঁর চার খলিফার সবাই সামান্য অক্ষরজ্ঞানসম্পনড়ব ছিলেন মাত্র। তবু মাত্র ৩৭ বছরে তারা অর্ধেক পৃথিবী জয় করেছিলেন। এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানে মাত্র একশ বছরের মাথায় মুসলিম সাম্রাজ্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের স্বীকৃতি পেয়েছিল। কারণ, মুসলিমরা যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই উন্নয়ন ও উদ্ভাবনী পড়াশোনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।

ব্যাপারটা হলো, আপনি কতটুকু শিক্ষিত—সেটা দেখার বিষয় নয়; আপনি কী শিক্ষা পেয়েছেন—সেটাই হলো আপনার আগামী পৃথিবী নির্মাণের হিরন্ময় হাতিয়ার।


মাসিক নবধ্বনির সৌজন্যে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *