ধর্ম এবং জাতিসত্তা— এ দুটোর উল্টো চিত্রটা আপনাকে বুঝতে হবে। একপিঠে লেখা থাকবে— মানবতা, ইনসানিয়্যাত, হিউম্যানিটি; অপরপাশে একদল লোক নিজ গরজে লিখে নিবে— ধর্মহত্যা, জাতিবিদ্বেষ, অমানবিকতা, চরমপন্থা।

ধর্ম এবং জাতিসত্তা— এ দুটো অভিধা অধিকাংশেই পরস্পরের সাংঘর্ষিক। হোক সেটা বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম, ক্রিশ্চিয়ান কিংবা ইসলাম। কেননা জাতিসত্তার অহংবোধ মানেই হলো অপর জাতিকে নিজের চেয়ে নীচ মনে করা। এ কারণেই ইসলাম সকল আরবি-আজমি, কুরাইশি-হানাফি, চৌধুরী-মাদানি, বাগদাদি-বাংলাদেশিকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

নো রেসিজম!
ইসলামে জাতি-গোত্র-অঞ্চল-বর্ণ-ভাষা নিয়ে কোনো বৈষম্যের স্থান নেই।
‘মুসলিম’— এটাই তাদের ধর্ম, এটাই তাদের একমাত্র জাতিসত্তা।

এর বাইরে গিয়ে কেউ অহংকারী হলে সে আমার দলভুক্ত নয়— রাসুলের সরাসরি হাদিস।

মায়ানমারের সাধারণ বৌদ্ধরা তো বটেই, তাদের উপাসনালয় প্যাগোডায় বুদ্ধিলাভে দীক্ষাপ্রাপ্ত পুরোহিতরাও আরাকানীয় রোহিঙ্গা মুসলিমদের সে দেশে থাকতে দিতে রাজি নয়। তারাও অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মুসলিম নিধনে বেশ তৎপর। অনেক হত্যাযজ্ঞেই তাদের সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে।

এখানে আমার যেটা প্রশ্ন— এসব বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কি ধর্মীয় কারণে মুসলমানদের সে দেশ থেকে তাড়াতে চাচ্ছে, নাকি জাতিগত বিভেদের কারণে?

যদি জাতিগত বিভেদের কারণে তারা এমন যুদ্ধংদেহী নিধনে নিজেদের শামিল করে থাকে, তাহলে আমি বলবো— বর্তমানে তারা গৌতম বুদ্ধ প্রণীত যে বৌদ্ধধর্মের পুরোহিত সেজে বসে আছে, সে ধর্মের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্কও নেই তাদের।

বৌদ্ধধর্মের ‘আয্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ বলে যে আটটি মূলনীতি রয়েছে, তার সবগুলোতেই রয়েছে কীভাবে সৃষ্টি ও সুন্দরের সাধনা করে বুদ্ধিলাভ করা যায়, নির্বাণসিদ্ধ হওয়া যায়। বৌদ্ধধর্মে ঘৃণা বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক সামান্য কথাও অহিতকর। যেকোনো সৃষ্টিজীবকে সামান্য যন্ত্রণা দেয়াও এ ধর্মে পাপ বলে বিচার্য!

সুতরাং জাতিবিদ্বেষ করতে হলে হয়তো তাদের পৌরহিত্য জলাঞ্জলি দিতে হবে, নয়তো বৌদ্ধধর্ম নতুন করে লিখতে হবে। তখন নতুন একজন রক্তলোলুপ অতীশ দীপঙ্করের প্রয়োজন হবে তাদের। 

আর যদি তারা স্বীকার করে যে— এ রোহিঙ্গা খেদাও, এমন হত্যাবিদ্বেষ তাদের ধর্ম থেকেই উদ্গত। তাহলে আমি বেশ ঠাণ্ডা মাথায় বলছি— এই পৃথিবীর জন্য তোমাদের প্রদর্শিত এ বৌদ্ধধর্ম বেমানান।

এমন বীভৎস হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাবিদ্বেষে উল্লসিত মতাদর্শ আমাদের পৃথিবীতে চাই না।
এমন জঙ্গি ধর্মবিশ্বাস মানবতার জন্য যেমন চরম বিপদজনক, তেমনি বিশ্বশান্তি ও প্রগতির পথেও বিরাট অন্তরায়।
এমন হত্যাউন্মাদ ধর্ম পৃথিবী থেকে বিলীন হওয়াটাই কাম্য।

…যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে— তারা বৌদ্ধধর্মের রক্ষার জন্যই মানুষ হত্যা করছে।

বৌদ্ধধর্মের মূল প্রতিপাদ্য বা তাদের ‘ফাতেহা’ হলো তিনটি বাণী—
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি
ধম্মং শরণং গচ্ছামি
সংঘং শরণং গচ্ছামি…

এ তিনটি বাণী কেবলই মানুষের অাত্মিক ও মনোদৈহিক শান্তির কথা বলেছে, দুঃখ মোচনের কথা বলেছে। অথচ ধর্মের অজুহাত দিয়েই তারা ছুরি-দা নিয়ে রোহিঙ্গাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এটাকে শরণং গচ্ছামি বলে না…!

সুতরাং বৌদ্ধধর্ম এবং তাদের জাতিসত্তার প্রশ্নটি এখন কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ ধর্মের নব্য আইএস-দের সেভাবেই পৃথিবীর সামনে প্রদর্শন করা হোক!


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *