‘আমি পাপিষ্ঠা। ব্যভিচারিণী।’
আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আঁৎকে উঠলেন। কী বলছে এ নারী? তার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? সবার সামনে এভাবে কেউ নিজেকে ব্যভিচারিণী বলে সাব্যস্ত করে? তার কি লোকলজ্জার ভয় নেই? সে কি জানে না ব্যভিচারের শাস্তি? সোজাকথায় মৃত্যুদণ্ড!
মেয়েটি তবু থামছে না। রাসুলের সামনে, আরও কয়েকজন সাহাবির সামনে সে অকপট বলছে—

হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে গোনাহ থেকে পবিত্র করে দিন। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে মহাপাপ করে ফেলেছি। কামনার তাড়নায় আমি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছি। আপনি আমাকে শাস্তি দিয়ে পবিত্র করে দিন। পরকালের ভয়াবহ শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। আমি অনুতপ্ত, আমাকে শরিয়তের শাস্তি দিয়ে পবিত্র করুন।

মদিনায় এমন ঘটনা এই প্রথম, কোনো নারী নিজে এসে স্বীকার করছে তার ব্যভিচারের পাপ। গোনাহ থেকে পবিত্র হতে মাথা পেতে নিতে চাইছে অমোঘ মৃত্যুর সাজা।

তাই ঘৃণা নয়, শাস্তি প্রয়োগের বেদনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা করেই মেয়েটির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মেয়েটি কান্নাজড়িত নয়নে আবার রাসুলের সামনে গেলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

মেয়েটি আবার সেদিকে গিয়ে অনুনয় করতে লাগলো— তাকে শাস্তি দেয়া হোক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আবারও অন্যদিকে মুখ ফেরালেন।
এভাবে আল্লাহর রাসুল চারবার তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন, যাতে মেয়েটি তার সামনে থেকে চলে যায়। যাতে সে তার পাপের কথা গোপন করতে পারে। যাতে সে অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে নিজেকে শুধরে নিতে পারে। যাতে সে এক পুণ্যবতী রমণী হয়ে মানুষের মাঝে বাঁচতে পারে। পরকালের ফয়সালা না হয় আল্লাহ রাহমানুর রাহিমই নির্ধারণ করবেন!

মেয়েটি কিছুতেই মানছে না। পাপের অনুশোচনায় সে এমনভাবে দগ্ধ হয়েছে, আল্লাহর শাস্তির ভয়াবহ আঁচ তার অন্তকরণ এমনভাবে ঝলসে দিয়েছে, পরকালের কঠিন শাস্তির চেয়ে দুনিয়ার শাস্তি তার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছে।
আল্লাহর রাসুলের সামনে কাতরকণ্ঠে বলতে লাগলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি জানি এ পাপের শাস্তি কতো ভয়াবহ! পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু তারপরও সেই শাস্তি স্বেচ্ছায় বরণ করে নিতে আমি প্রস্তুত আছি। দুনিয়ার এই সামান্য শাস্তির চেয়ে আখেরাতের শাস্তি অনেক ভয়াবহ, সীমাহীন যন্ত্রণাদায়ক। তাই দয়া করে আপনি দুনিয়ার শাস্তি কার্যকর করে আখেরাতের অসহনীয় শাস্তি থেকে আমাকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা করে দিন। নইলে আমি সারাটি জীবন এক দুঃসহ যাতনা বয়ে বেড়াবো। অনুশোচনার অনুতাপ আমাকে পলেপলে যন্ত্রণা দিয়ে যাবে। আখেরাতে আল্লাহর সামনে আমি আপনার সুপারিশ নিয়ে দাঁড়াতে চাই।

মেয়েটির অস্বাভাবিক কাতর অনুনয়, তার অনুতাপের প্রত্যয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ব্যথিত করলো। তিনি ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কঠোর হলেন। মেয়েটিকে বললেন, তুমি এই ভরমজলিসে স্বেচ্ছায় তোমার অপরাধের কথা বারবার স্বীকার করেছো। তাই তোমার উপর শাস্তি কার্যকর করা যেতে পারে। কিন্তু যেহেতু তুমি এখন গর্ভবতী, তাই তোমার মৃত্যুদণ্ড এই মুহূর্তে কার্যকর করা যাবে না। কারণ, তুমি দোষী হলেও তোমার গর্ভের সন্তান দোষী নয়। সে নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ ও পবিত্র। তোমার কারণে তার প্রাণদণ্ড হতে পারে না।

মেয়ে, তুমি এখন চলে যাও। তোমার সন্তান জন্ম নেয়ার পর তুমি আবার এসো। তখন তোমার শাস্তির ব্যাপারে ফয়সালা করা হবে।

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো। আহ্! অনুশোচনা!!

(চলবে)

[‘সিংহহৃদয়’ গ্রন্থ থেকে]


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *