‘রসূল (সা.)কে নিবেদিত কবিতা’ বইটি পেলাম এহসানের বাসায়। এর আগে আসাদ বিন হাফিজ ও প্রয়াত মুকুল চৌধুরী সম্পাদিত ‘রাসুলের শানে কবিতা’ কাব্যসংকলনটি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রচিত বিখ্যাত সব রসুলপ্রশস্তি কবিতা স্থান পেয়েছিল। বইটি পড়ে বিশেষ ঋদ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু হাতে নেয়া বইটি কেবলই বাঙালি কবিদের রসুলপ্রশস্তি দিয়ে সাজানো হয়েছে। এটি এ গ্রন্থের প্রথম বিশেষত্ব।

‘রসূল (সা.)কে নিবেদিত কবিতা’ সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন ইশরাফ হোসেন। তাঁর নাম শুনিনি আগে। তবে আবদুল মান্নান সৈয়দ সংকলনটির ভূমিকা লিখেছেন, ফলে একটি গ্রহণযোগ্যতা আপনা থেকেই দাঁড়িয়ে যায়।

নিরুদ্বেগ ভাবনা নিয়ে বইটি চোখের সামনে মেলে ধরলাম। ইচ্ছে ছিল, প্রথমে মান্নান সৈয়দের ভূমিকাটা পড়ব, তারপর কবিতার অন্দরে দাখিলা দিব। কিন্তু আগে একবার পুরো বইয়ের কবিতাসম্ভারে চোখ বুলিয়ে নেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।

অবধারিতভাবে প্রথমে আনা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের আঠারোটি রসূলপ্রশস্তি বা নাতে রাসুল (সা.)। এরপর শাহাদৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, জসীম উদদীন, বে-নজীর আহমদ, ফররুখ আহমদসহ গত শতাব্দীর বিখ্যাত কবিদের একটা দুটো করে কবিতা স্থান দেয়া হয়েছে।

এগুলো কালোত্তীর্ণ কবিতা। নতুন করে এসব নিয়ে কথা চলে না। আমার আগ্রহ ছিল আধুনিক কবিদের কবিতা নিয়ে। তো, এ কারণে আমি বইয়ের একদম শেষে চলে গেলাম। শেষ থেকে নতুন ও তরুণ কবিদের রসুলপ্রশস্তি পড়তে শুরু করলাম।

 

দুই

তরুণদের কবিতাগুলো বেশ প্রথাগত কথাবার্তায় টইটম্বুর। সবার না, তবে অনেকেরই। রসুলপ্রশস্তি কবিতার প্রথাগত কিছু শব্দ আছে যেমন, আলো, নুর, জ্যোতি, ফুল, মরু সাহারা (যদিও সাহারা মরুভূমি মক্কা-মদিনায় এমনকি আরবে অবস্থিত নয়, সেটা আফ্রিকায়), হেরা গুহা, মা আমেনার কোল, এতিম নবী-এমনতর আরও পুরোনো উপমা ব্যবহার হয়েছে তরুণদের কবিতাগুলোতে। অধিকাংশের কবিতায় নতুন ভাব বা নতুন কোনো শব্দের পোঁচ দেখতে পেলাম না।

কয়েকজনের কবিতা উদ্ধৃত করছি। কবি শাহেদ সাদ উল্লাহ লিখেছেন,

তুমি
আলোর ভেতরে আলো, যেমন তুমি
উদ্ভাসিত, সমুজ্জ্বল তোমার গাত্র
পৃথিবী চৌচির, তুমি এলে বেরিয়ে
অপাপ পুণ্যে ভরালে তাবৎ পাত্র…

খুব দরিদ্র ছন্দে রচিত হয়েছে কবিতার প্রথম স্তবকগুলো। কিছু শব্দ ছন্দের জন্য জোর করে টেনে আনা হয়েছে। পড়লে বুঝতে কষ্ট হয় না, কেবল ছন্দের কারসাজি করার জন্য কবিতার গলা নানা জায়গায় চেপে ধরা হয়েছে।

কবি ফাহিম ফিরোজ লিখেছেন,

অন্ধকার চিরে আলোকিত চেরাগ হাতে
হঠাৎ একদিন বেরিয়ে আসলেন
আলোর মানুষ। তাহার ভেতর থেকে
আরো সংখ্যাভারী বিভা…

এই যে আলো, নুর, বিভা-এসব শব্দ বাংলা রসুলপ্রশস্তি কবিতায় শত শত বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। সেই রামাই পণ্ডিত, সেখ চাঁদ, সৈয়দ আলাওল, সৈয়দ হামজা, আবদুল হাকিম, শাহ মুহাম্মদ সগীরের প্রাচীন পুঁথি থেকে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে বাংলা কবিতায়, আজও আমাদের তরুণরা সেই শব্দ সম্ভারেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। রসুলপ্রশস্তি নিয়ে তাদের নতুন কোনো নিরীক্ষা নেই, নতুন উপমার শরণ নেই, নেই রাসুলকে নিয়ে আতিশয্য ভালোবাসার নতুন কোনো দিলচসপি।

নজরুল, ফররুখ, গোলাম মোস্তফা, বে-নজীর আহমদ সবাই এই উপমাগুলো ব্যবহার করেছেন। তবে তাঁরা তাদের ছন্দের দ্যোতনা, ভাবের গভীরতা, কাব্যের সুষমা দিয়ে শব্দগুলোকে বাঙময় করতে পেরেছেন। কিন্তু আধুনিক কবিতায় সেই ছান্দসিক দ্যোতনা, ভাবের গভীরতার অভাব প্রকটভাবে চোখে লাগছে। সত্যি করে বলতে গেলে, গত ৫০ বছরে রসুলপ্রশস্তি নিয়ে কালোত্তীর্ণ কবিতা খুব একটা রচিত হয়নি। নজরুল-ফররুখ যা লিখে গেছেন সেগুলোই এখন পযন্ত তামাম বঙ্গবাসীকে মদিনার দিকে রাহনুমায়ি করছে।

মনে রাখতে হবে, একই বিষয়কে কেন্দ্র করে শত বছর ধরে ব্যবহৃত পুরোনো শব্দ ও উপমা ব্যবহার যে কোনো কবিতার খামতি। কবিতার খামতি না বলে আমি বরং এটাকে কবির খামতি বলব। একজন কবি যদি পুরোনো বাক্য ও উপমা ব্যবহার থেকে নিজেকে বের করে আনতে না পারেন, তবে কবি হিসেবে তিনি গোত্রীয় মান হারাবেন।

সংকলনে স্থান পাওয়া আল মাহমুদের কবিতাও এই দোষে দুষ্ট। তাঁর কবিতার প্রথম আটটি লাইন তুলে ধরছি:

গভীর আঁধার কেটে ভেসে ওঠে আলোর গোলক,
সমস্ত পৃথিবী যেন গায়ে মাখে জ্যোতির পরাগ;
তাঁর পদপ্রান্তে লেগে নড়ে ওঠে কালের দোলক
বিশ্বাসে নরম হয় আমাদের বিশাল ভূভাগ।

হেরার বিনীত মুখে বেহেস্তের বিচ্ছুরিত স্বেদ
শান্তির সোহাগ যেন তাঁর সেই ললিত আহ্বান,
তারই করাঘাতে ভাঙে জীবিকার কুটিল প্রভেদ
দুঃখীর সমাজ যেন হযে যাবে ফুলে বাগান।

আলো, জ্যোতি, হেরা, ফুল এবং আল মাহমুদের প্রিয় শব্দ ‘কালের’ দোলক। সেই পুরোনো মানচিত্রে ঘুরপাক খেয়েছে আল মাহমুদের রসুলপ্রশস্তি। তবে তাঁর মুনসিয়ানা হলো, তিনি স্তবকের মধ্যে উপমা টেনেছেন চমৎকারভাবে। যেমন, ‘জ্যোতির পরাগ’, ‘ললিত আহ্বান’, ‘শান্তির সোহাগ’। এসব উপমা তাঁকে রসুলপ্রশস্তির কবি হিসেবে উতরে যেতে সাহায্য করবে বটে, তবে তিনিও প্রাচীন নদী সাঁতরে এসে গা থেকে শব্দের পানি মুছে ফেলতে পারেননি।

 

তিন

এ পাঠ-প্রতিক্রিয়া পাঠ করার আগে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি মনে করছি, তাতে এই লেখকের ব্যাপারে পাঠকের ভুল ধারণা কিছুটা হলেও প্রশমন হবে। এই পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় আমি কোনো কবির হৃদয়জ ভাব ও আবেগকে তাচ্ছিল্য বা খাটো করে দেখছি না। হতে পারে কোনো কবির হৃদয়ে রাসুলকে নিয়ে আবেগের কমতি নেই, রাসুলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অঢেল, কিন্তু শব্দ ও কাব্যের বহিঃপ্রকাশে তিনি মার খেয়ে গেছেন, অর্থাত কাব্যবিচারে তাঁর কবিতা উত্তীর্ণ নয়; সুতরাং আমি তাঁর কবিতারই কেবল ব্যবচ্ছেদ করছি, তাঁর অন্তর্গত ভাবাবেগকে নয়।

 

চার

যাকগে, আরও কিছু ব্যবচ্ছেদের দিকে যাওয়া যাক। সংকলনে স্থান পাওয়া আধুনিক কবিতাগুলোর মধ্যে কিছু কবিতা অনর্থক সংযোজন করা হয়েছে। এসব কবিতার মান কোনো সংকলনে স্থান পাওয়ার মতো নয়। এমন দু-একটি কবিতাংশ তুলে ধরছি:

কবি লিলি হক লিখেছেন,

মুসলিম হয়ে জন্ম আমার
তাঁর তরে শোকর হাজার বার
হে পরওয়ার দেগার
আরো শোকর খোদা দরবারে তোমার
দয়াল নবী হজরতের (সা.) হয়েছি আমরা উম্মত
যার প্রতিটি কথা ও কাজই ছিল এবাদত…

এটি একখানি কবিতা নাকি তাবলিগের ছয় নম্বরের তালিম, সেটা বুঝতে পারার কথা ছিল সম্পাদক মহোদয়ের। এ কবিতায় না আছে ছন্দের কোনো ব্যবহার, না আছে কবিতার বাক্যগঠনের হাতযশ; নিছক কিছু ছয় নম্বরী তথ্য ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে ছোট-বড় লাইনের কৌটিল্যে। এটা যদি কবিতা হয় তাহলে ফাজায়েলে আমাল গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি কর্তৃক পুরষ্কৃত করা দরকার। হয়তো সংকলনের কলেবর বৃদ্ধি করার জন্য নামকাওয়াস্তে কবি যারা তাদেরও স্থান দেয়া হয়েছে।

এমন আরও কিছু কবিতার বাহুল্য চোখে পড়েছে সংকলনটিতে। কলেবর বৃদ্ধি বা অনুরোধের ঢেঁকি গেলার স্বার্থে এ ধরনের অনুত্তীর্ণ কবিতার সংযুক্তি একেবারেই উচিত হয়নি।

সংকলনটি ঘাটতে গিয়ে আরেকটি বিষয় আবিষ্কার করে চমৎকৃত হয়েছি। নারীরা কেন কবিতায় কাঁচা-তার একটা বড় প্রমাণ পেয়ে গেলাম এখানে। লিলি হকের কবিতা তো গেল, সংকলনে স্থান পাওয়া আরও দু-একজন নারী কবির কবিতা উদ্ধৃত করছি। পাঠকমাত্রই নারী কবিদের কবিতার তলানী খুঁজে পাবেন এর মাধ্যমে। তবে আমি মোটামুটি নিশ্চিত, কবিতায় নারীরা বরাবরই দুর্বল। দু-একজন মার্জিনের বাইরে অবশ্যই আছেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে নারীরা কবিতার ভাষা ও ভাবকে ধারণ করতে অক্ষম।

নার্গিস চমন লিখেছেন,

কার নামে আজ গায়রে কোয়েল
কার নামে আজ গায়রে দোয়েল
উছলে ওঠে ঢেউরে নদীর
জোছনা ঢালে চাঁদরে অধীর
পলাশ বকুল
হয় রে আকুল
নাচে হিজল-তমাল-পিয়াল
পদ্মা-মেঘনা সন্ধ্যা পাল
এক সাগরে মিলতে এসে
হয় পরিচয় অবশেষে
সেই মোহনার নামটি হলো
সবাই যারে রসুল বলো
মা আমিনার দুলাল সে-যে
সবাই তাকে দরুন ভেজে
দরুদ পড়ি আমিও আজ
নবী আমার সবার তাজ।

পুরো ছড়াটি তুলে দিলাম। এটিকে কবিতা না বলে ছড়া বলাই ভালো। এ ধরনের ছড়া সংকলনে স্থান পাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, ভাবা দরকার। এসব কবিতা কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর ইউটিউবীয় গান হতে পারে, কোনো সংকলনে স্থান পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করি না।

 

পাঁচ

অনেক কবি আছেন যারা কঠিন কঠিন শব্দ দিয়ে কবিতা রচনা করাকে এবাদত মনে করেন। সেটা অনেকের ক্ষেত্রে সৌন্দর‌্য যদিও, তবে যারা শব্দখেলা বোঝেন না তাদের জন্য সেগুলো ‘শব্দবোঝা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। বড় কবিরা অনেক কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করে কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-ফররুখ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথমত কঠিন শব্দের অর্থের ব্যাপকতা আপনাকে বুঝতে হবে এবং সেটাকে বাক্যের সঠিক স্থানে যুতসইভাবে ব্যবহারের কায়দা জানতে হবে। বলা নেই কওয়া নেই আচমকা বাক্যের মাঝে ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ শব্দটা ঢুকিয়ে দিলেই বড় শব্দ জাননেওয়ালা কবি বলা যাবে না। শব্দ প্রুফরিডারও জানে। সেটাকে সঠিক মাত্রাজ্ঞান অনুযায়ী যে ব্যবহার করতে পারে, তিনিই কবি।

আবু বকর মুহাম্মদ সালেহ’র কবিতার শেষ কয়েকটি লাইন দেখুন,

তুখোড় ভাবে শাণিত বোধ এফোঁড় ওফোঁড় করে
অবাঞ্চিত পাপীদের দৌরাত্ম্য
লোচন খুলে অবাক চেয়ে থাকে
আদিম পৃথিবীর নির্বাসিত আদম…

এই যে আৎকা চোখের স্থানে ‘লোচন’ চলে এল, কী প্রয়োজন ছিল এই শব্দটির? শব্দটি কি বাক্যকে নতুন কোনো সুষমা দিয়েছে? শুনতে ভালো লাগে? ছন্দের নতুন কোনো ব্যঞ্জনা এনেছে? না, মূলত কবি এখানে আমাদেরকে তাঁর মুখস্থ করা শব্দের বাকশো খুলে দেখাতে চেয়েছেন, যাতে করে আমরা তাঁর কবিতা পাঠ করার আগে একটা অভিধান খুলে পাশে রেখে নেই।

বেশ কিছু কবিতায় এ ধরনের কোষ্ঠ-কাঠিন্য রোগ আছে। কবিতায় ভাবের চেয়ে যখন শব্দের আতিশয্য অধিক হয়ে যায় তখন সেখানে কেবল শব্দের কঙ্কাল পড়ে থাকে, কবিতার কিছুই আর থাকে না। জীবনানন্দের কবিতা সাধারণ আটপৌড়ে শব্দে লেখা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কবিতার অন্তর্গত গভীর ভাবনা কবিতাপাঠককে কিছু সময়ের জন্য হলেও নীরব করে দেয়, কিছু একটা ভাবতে বাধ্য করে। এটাই কবিতার সত্ত্বা। বাদবাকি সকলই গরল।

 

ছয়

কিছু কবিতা আমার কাছে একেবারেই অতিকথন মনে হয়েছে। কবি হাসান আলীম লিখেছেন,

হালীমার গৃহে চাঁদ বেড়ে ওঠে দুধে ও মাখনে
হালীমার স্নেহলতা আকাশের সীমানা ছাড়ায়
হালীমার আঁচলের খুদঝরে আরশের গায়
হালীমার প্রাণপক্ক রাসূলের কপলে নয়নে।

কবির শব্দচয়নের ভঙ্গিমা নিতান্ত নিম্নরুচির। ভাবাবেগেরও অভাব লক্ষণীয়। তার চেয়ে বড় যে কথা, সংকলনটিতে বানান ভুল বেশ চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি কবিতায় দু-চারটে করে বানান ভুল। এ বিষয়টি কবিতাপাঠের সময় বেশ পীড়া দিয়েছে।

সৈয়দ আজিজুল হক লিখেছেন,

পৃথিবীর সৃষ্টির আগে মহান স্রষ্টা ছিলেন বড় একা
তাই নিঃসঙ্গ তার পাশে একজন বন্ধুর কথা ভাবলেন
তিনি আপনার রূপ থেকে কিছু রূপ নিয়ে
ময়ূরের বেশে রাখলেন বন্ধুকে স্বর্গধামে।
কোটি কোটি বছর অতিবাহিত হবার পর
একদিন স্রষ্টা ডাকলেন ফেরেস্তাদের
আর বললেন আমি তোমাদের এবাদতে খুশী নই…

এই যে রসুলপ্রশস্তির নামে অতিকথন, এগুলো কবিতার চে কবির অজ্ঞতা প্রকাশ করে বেশি। এ সংকলনের কিছু কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে, যারা রসুলপ্রশস্তি লিখেছেন তারা কেবল কবিই, যুগ যুগ ধরে কেবল কবিতা লেখার কারিকুলাম শিখেছেন। পুস্তকাদি পাঠ করার প্রয়োজন তাদের খুব একটা হয়নি কখনো। ফলে, রাসুলের জীবন ও জীবনী সম্পর্কে তাদের প্রচুর অজ্ঞতা রয়ে গেছে। রাসুলের প্রশংসা করে কিছু লিখতে হবে, তাই লিখেছেন দু-চার ছত্র কবিতা। কিন্তু সেই কবিতার মাধ্যমে তারা সগর্বে জানান দিয়েছেন রাসুলের ব্যাপারে তাদের অজ্ঞতার।

যাকে নিয়ে কবিতা লিখবেন তার ব্যাপারে যদি আপনি সম্যক ধারণা না রাখেন, তাহলে শত উপমা ব্যবহার করুন বা যতই শব্দের মারপ্যাঁচে ছন্দের কারুকাজ টানুন, সেগুলো কেবল অসাড় শব্দমালাই হবে। উপরোল্লিখিত কবিতাংশ দেখুন, এখানে তথ্যের মারাত্মক বিভ্রান্তি আছে, আছে বিশ্বাসিক ব্যাপারও। যেসব তথ্য এ কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে সেগুলো অনেকাংশে গোনাহর স্তরে চলে যায়। যেমন, আল্লাহ নিঃসঙ্গ ছিলেন তাই তিনি মুহাম্মদকে সৃষ্টি করলেন, রাসুল ময়ূর বেশে বেহেশতে বিচরণ করেছেন। এগুলো নিরেট বিভ্রান্তি এবং শিরক স্তরের কথা। চরমতম অজ্ঞতা থেকে এসব তথ্যের সন্নিবেশ হয়েছে।

এখানে আরেকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। উর্দু ও ফারসি ভাষার রসুলপ্রশস্তি কবিতায় প্রচুর পরিমাণে শিয়া প্রভাব বিদ্যমান। যেহেতু প্রাচীনকালে পারস্য থেকে এই উপমহাদেশে অনেক শিয়া ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিবর্গ এসেছেন এবং এখানকার দাপ্তরিক ভাষা যেহেতু ছিল ফারসি, এ কারণে শিয়া বিশ্বাসের অনেক বিষয় ইসলামি কাব্যচর্চায় ঢুকে গেছে। বিশেষত ফাতেমা, হাসান-হোসাইন, কারবালা, মহররম এগুলো অনেক শতাব্দী ধরে আমাদের ধর্মীয় সাহিত্যে বিরাজ করছে। বানোয়টি গল্পে ভরা ‘বিষাদ সিন্ধু’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একইভাবে এখানে কবি সৈয়দ আজিজুল হক বিভ্রান্তমূলক যেসব তথ্য পরিবেশন করলেন, এসবও শিয়া প্রভাবিত ধর্মীয় মিথ থেকে উৎসারিত।

আ.ন.ম. বজলুর রশীদ রাসুল সা. এবং খাদিজা রা.-এর প্রেমপরিণয় নিয়ে একখানা কবিতা রচনা করেছেন, বেশ বড় কবিতা। অনেকটা নাটিকার মতো করে কাব্যনাট্য নির্মাণ। সেখানে তিনি যেরকম স্বাধীনভাবে দুজনের প্রেমকে উপস্থাপন করেছেন, পুরোটা নির্জলা বানোয়াট। রাসুলের জীবনকে না জেনে কেবল কল্পনার আশ্রয় নিয়ে এভাবে কবিতা রচনার স্বাধীনতা ইসলাম মনোনয়ন দেয় না। কবিতা বলেই সেখানে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে কলম চালনা, এত স্বাধীনতা থাকলে ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ কী দোষ করেছিল?

 

সাত

যাক, এতক্ষণ ব্যবচ্ছেদের পর এবার কিছু আশা জাগানিয়া কথা বলি।

নজরুল-ফররুখ বা দিগ্গজ কবিদের কবিতা নিয়ে বলার মতো আস্পর্ধা আমার নেই। এছাড়া ব’নজীর আহমদ, জাহানারা আরজু, সানাউল্লাহ নূরী, সৈয়দ আলী আশরাফ, ফারুক মাহমুদ, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, ওমর আলী, জুবাইদা গুলশান আরা, মসউদ-উশ-শহীদ, আবিদ আজাদ, মুকুল চৌধুরী, রুহুল আমীন খান, মহিবুর রহিম, জহির আহমেদ এবং আরও অনেকের কবিতা ভালো লেগেছে। আগেই বলে নিয়েছি, যারা প্রথিতযশা তাদের নাম ও কবিতার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে আমি অপারগ বলে তারা এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেননি। সুতরাং সেসব কবিতার মানবিচার বা আলোচনার এরাদা আমার মোটেও নেই।

সংকলনটিতে বর্তমান সময়ে যাদের কবিতা বেশি ভালো লেগেছে তাদের কথা বলব এবার। সবচে ভালো লেগেছে আসাদ চৌধুরী এবং আব্দুল হাই শিকদারের কবিতা। শিকদারের কবিতা প্রায় চার পৃষ্ঠা জুড়ে। সেখান থেকে ভালো লাগা কয়েকটি লাইন তুলে দিচ্ছি।

মুহাম্মদ (সা.) আপনি এমন কেন
আমার উপকূল জুড়ে আপনার বেলাভূমি
তায়েফের বনে একজন রক্তাক্ত মানুষের দুর্লভ উচ্চারণ থেকে
আমার দূরত্বকে আমি বাড়াতে পারিনি কোনোদিন
আমার পরমায়ুর সমূহ সীমাবদ্ধতার মুহাম্মদ (সা.)
কেবলমাত্র আপনার নামের বাতিঘর
প্রলুব্ধ মক্ষিকার মতো আমার গহন রক্তে ও ঘুমে
উন্মাতাল আলোর নাচনে আমাকে অস্থির করে শুধু
এই অস্থিরতার বাইরে আমি কোথায় যাবো…

কবিতার মধ্যে আবেগ এবং ভাবের এই যে গভীরতা, এগুলোই কবিতার নিয়ন্তা। প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের আরশি ছুঁয়ে এসেছে। শব্দকে কাঠিন্যের বেড়ি পরানো হয়নি, স্বভাবসিদ্ধ ব্যবহারিক শব্দাবলি দিয়ে ভাবের গভীরতাকে বাজারের চৌরাস্তায় দাঁড় করানো হয়েছে। চারদিকে কোলাহল, কিন্তু নৈশব্দের মতো একা দাঁড়িয়ে আছে প্রতিটা লাইন।

আসাদ চৌধুরীর কবিতা থেকে কয়েকটি প্রাণবন্ত লাইন উদ্ধৃত করছি:

কিন্তু আপনার স্বীকৃতি আর সমর্থন না-পেলে
কার সাধ্য সবুজ গম্বুজের নীচে ত্রস্ত ছায়া রাখে?
নিজের যোগ্যতা দিয়ে এখানে আসিনি
নিজের যোগ্যতা নিয়েও এখানে আসিনি
তোমার মেহেরবানী, যুক্তিহীন অপার করুণ আছে, তাই
দণ্ড দুয়ের তরে এখানে এসেছে গুনাহগার…

রাসুলের রওজার সামনে দাঁড়িয়ে কবির যে ভাবাবেগের উদয় হয়েছিল, তার বয়ান তিনি বিবৃত করেছেন কবিতার অক্ষরমালায়। আসাদ চৌধুরীকে নিয়ে আমার বলবার মতো কিছু কথা আছে। বছর আট-দশ আগে একুশে বইমেলায় আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে মেলা চত্বরে দেখা হলো। আমি তাঁর অনূদিত ফিলিস্তিনি একটি কবিতার বই খরিদ করেছিলাম এবং তাঁর অটোগ্রাফও নিয়েছিলাম সম্ভবত। অত বড় কবিমানুষ এর আগে আমি আর কখনো দেখিনি। দু-চার কথা বলে ঋদ্ধ হয়েছিলাম। পরে একদিন বন্ধু মহিম মাহফুজের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, আসাদ চৌধুরী উর্দু-ফারসি জাননেওয়ালা লোকদের সোহবতে থাকতে পছন্দ করেন এবং তিনি তাদের থেকে ভাষাগত ফায়দা হাসিলেরও কোশেশ করেন। আমার ইচ্ছা হয়েছিল, সুযোগ পেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে বাতচিত করবো খানিক। কিন্তু সে সৌভাগ্য আর হয়ে ওঠেনি।

অবিশ্বাসের ভীড়ে আসাদ চৌধুরী বেশ খানিকটা বিশ্বাসী কবি। কবি হিসেবেও তিনি উজ্জ্বল। কিন্তু তাঁর বিশ্বাসের কারণেই তিনি প্রগতিশীল প্রাঙ্গনে কখনো খুব একটা সমাদর পাননি। বিশ্বাসীরাও তাঁকে পাতে উঠাতে চেষ্টা করেনি কখনো। তারা তো লেখক-কবিদের দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয় আর বলে, ‘আশশুআরাউ য়্যাত্তাবিউহুমুল গাবুন…’! কবিরা সব নষ্টলোক। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের কবিতা ও সাহিত্য বিশ্বাসী লোকদের হাতছাড়া হয়ে আছে। অথচ একজন আসাদ চৌধুরী কিংবা আব্দুল হাই শিকদারকে যদি সম্মান করা যেত তবে বাংলাভাষা আরও অনেক ইসলামি ভাবধারার কবিতা ও কবি পেত।

 

আট

এখানে আরেকটি নোক্তা বয়ান করি। এই যে ‘রাসুলের শানে কবিতা’ সংকলনটি, এমন একটি সংকলন বাংলাদেশের কোনো মাদরাসা থেকে কেন প্রকাশ হলো না? এই প্রশ্ন করার হাজারও যৌক্তিক কারণ আমার কাছে আছে। যে মাদরাসা দাবি করে তারা শতভাগ খাঁটি ইসলাম ধারণ করে আছে, তাহলে কেন মাদরাসা থেকে হাসসান ইবনে সাবিত, কাব ইবনে মালিক, আলি ইবনে আবু তালিবের মতো কবি জন্ম নেয় না? কেন তাদের কবিতার অনুবাদ-সংকলন বের হয় না?

যারা মাদরাসার দরসে আর মাহফিলের মঞ্চে রাসুলপ্রেমের তুবড়ি ছুটিয়ে দফায় দফায় উর্দু-ফারসি শের আওড়ান, অথচ তাদের মাদরাসার কোনো ছেলে কবিতা লিখলে তার ডায়েরি বাজেয়াপ্ত করা হয়, তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেয়া হয়; কখনো কখনো মাদরাসা থেকেও বহিষ্কার করা হয়। তারাই আবার সিরাত মাহফিলে তায়েফের ঘটনা বলে কেঁদে কেটে বুক ভাসায়।

একজন ত্বলাবার কবিতায় যদি হাতেখড়ি না হয় তবে সেই হাত দিয়ে রসুলপ্রশস্তি কীভাবে লেখা হবে? একটা হাতকে কবিতার মশকো করতে দিন, তারপর সে হাতটাকে রাসুলের প্রশস্তি নিয়ে কবিতা লেখার তরবিয়ত দিন। একদিন ঠিকই বাংলাভাষায় শেখ সাদি আর জালাল রুমির জন্ম হবে।

যাদের রসুলপ্রশস্তি কবিতা লেখার কথা ছিল, যাদের হাতে অজস্র পুণ্যগত শব্দের তশতরি সজ্জিত, বাংলাদেশে রাসুলকে নিয়ে কবিতার লেখার অধিকার যাদের সবচে বেশি, তারা কবিতার মতো ‘পঙ্কিল’ সায়রে কখনো সাঁতার কাটতে চাননি। কবিতাকে তারা মনে করেন অচ্ছুৎ অস্পৃশ্য। এই দুঃখ রাখি কোথায়?

আশার কথা হলো, আধুনিক এই সময়ে মাদরাসা-দহলিজের ভয়কাতুরে শৃঙ্খল ভেঙে অনেক ত্বলাবা কবিতা লিখছেন এবং সেগুলো প্রকাশ করছেন। এই প্রবণতা বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো তুমুল হওয়া দরকার। আমি চাই, আগামী দশ বছর পর যেন বাংলাদেশের মাদরাসাগুলো থেকে এমন দশটা কাব্য সংকলন প্রকাশ পায়। রাসুলের শানে কবিতা, আল্লাহর মহত্বের কবিতা, সাহাবিদের শানে কবিতা, ইতিহাস নিয়ে কবিতা, দেশ নিয়ে কবিতা, প্রেম নিয়ে কবিতা-সব হোক। একদিন বাংলাদেশই হয়ে ওঠবে রসুলপ্রশস্তির সবচে উর্বর ভূমি।


রসূল (সা.)কে নিবেদিত কবিতা
সম্পাদক: ইশরাফ হোসেন
ভূমিকা: আবদুল মান্নান সৈয়দ
প্রকাশক: সৈয়দ আলী নকী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশকাল: ১৯৯৫
মূল্য: ২০০ টাকা (প্রথম প্রকাশ)